
সত্যি, না কি??
‘কি রে, এদিকে কোথায়?’ প্রশ্নটা শুনে পেছনে মুখ ঘুরিয়ে দেখি, কানাইদা। দাঁড়াতেই হল, আমাকে দাঁড়াতে দেখে কানাইদা আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘তোর বাড়ি তো উল্টো দিকে, তাহলে এখানে ঘুরঘুর করছিস কেন?’
বললাম, ‘দেখতেই তো পাচ্ছো, ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, তার মানে খাবার নিতে এসেছিলাম’।
‘হ্যাঁ, কিন্তু ক্যান্টিন তো বন্ধ’, কানাইদার গলায় কৌতুকের সুর।
‘সেটা তো আমি এখন দেখতে পাচ্ছি, আসার আগে যদি জানতাম, তাহলে তো আর আসতাম না। সবাই বলল, আজ থেকে নাকি ক্যান্টিন খুলেছে, তাই দুপুরের খাবারটা নিতে এসেছিলাম’ অকপটে স্বীকার করলাম।
‘গুজব, বুঝলি, গুজব’ বিজ্ঞের মত বলল কানাইদা।
‘তুমি এখানে কি মনে করে?’
‘আমিও তোর মত, সেই গুজবের চক্করে’ কানাইদার গলায় আক্ষেপ, ‘বোঝা উচিৎ ছিল আমার। যাই হোক, বাড়ি ফিরবি তো খালি হাতে? চল, তোর সাথে কিছুদূর যাই।‘
এই প্রস্তাবে না করা যায় না। এখানে কানাইদার পরিচয়টা একটু দেওয়া দরকার। কানাইদা আমার সাথে প্রায় একই সময়ে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছে। কোন রাজ্যের লোক, ঠিক জানি না, তবে অবাঙালি, কিন্তু বাংলাটা আমার থেকে ভালো বলে। কি বিষয়ের ওপর গবেষণা জিজ্ঞাসা করতে একদিন বলেছিল, ’সে কি আর একটা, তবে ইন জেনারেল বলতে হলে, হিউম্যানিটি’। আমি জানি এখানে সেরকম একটা ডিপার্টমেন্ট আছে, তবে বিল্ডিংটা কোনদিকে জানি না। মাঝে মধ্যে দেখা হয় কানাইদার সাথে, অফিস যাবার পথে বা ফেরার সময়। চীনের নতুন বছরের ছুটিতে এই বছরও বাড়ি যায়নি, জিজ্ঞাসা করলে বলেছে, ‘কদিন পরে যাবো, এই তো এলাম’। এই ক’বছরে অনেকবার কানাইদার কাছ থেকে অনেকরকম সাহায্য পেয়েছি, পেপার পাবলিশ হচ্ছে না কিম্বা কোন কাজ আটকে গেছে, কানাইদা হাজির মনের জোর বাড়াতে, কাজ হয়ে গেছে কিন্তু গুছিয়ে লিখতে পারছি না – কানাইদা দেখিয়ে দিয়েছে, কারুর কোন ব্যবহারে মাথা গরম হয়েছে কিন্তু কিছু করতে পারছি না নিষ্ফল রাগে ফোলা ছাড়া – কানাইদা শান্ত ভাবে বুঝিয়েছে। এরকম আরও কত কি, সব লিখতে গেলে এই লেখাটা অনেক বড় হয়ে যাবে। তো এহেন কানাইদার সাথে একসাথে আগেও ফিরেছি, বেশ মজার মজার কথা বলতে পারে লোকটা, তাই ভালোই লাগে। আজ যদিও মেজাজটা বিগড়ে ছিল, তাও বললাম, ‘চলো, আর কি করব? বাড়ি ফিরে আবার রান্না করতে হবে।‘
কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর কানাইদাই প্রথম কথা বলল, ‘কি হলো, একবারে থম মেরে গেলি যে’। আমি কিছু বলছি না দেখে, তারপর নিজেই বলল, ‘আসলে গুজব জিনিসটাই এরকম বুঝলি, সত্যিটা জানার পর নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে।‘
আমি বললাম, ‘আসলে রোজ রোজ রান্না করতে আর ভালো লাগছে না। কি যে করল না এরা, সারা পৃথিবী এখন এর ফল ভোগ করছে।‘
কানাইদা অবাক হয়ে বলল, ‘এরা করল মানে, কি করল?’
‘কেন, সবাই তো বলছে, উহানের ল্যাব থেকে ভাইরাসটা বাজারে ছড়িয়েছে। মানুষের কাজ এটা, রাজনৈতিক চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়।‘
‘রাজনৈতিক চক্রান্ত নয়, রাজনৈতিক গুজব বল।‘
‘গুজব?’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
‘তা ছাড়া আর কি? আজকের ক্যান্টিনের ঘটনাটার মতই এটা গুজব ছাড়া আর কিছু নয়।‘
‘সে তো তুমি বলবেই। এখানে থাকছ, রোজগার করছ, এই জায়গার নামে নিন্দে সইবে কেন?’
‘আরে সেটা একটা কারণ বটে, কিন্তু সেটাই সব নয়। আচ্ছা বলতো, ভাইরাস কি?’
আমি বললাম, ‘সেতো সবাই জানে, খুব সহজ ভাবে বলতে গেলে, এরা খুব ছোট ডিএনএ বা আরএনএ এর টুকরো যার বাইরে থাকে একটা প্রোটিনের ঢাকনা। কোন প্রাণী বা উদ্ভিদের কোষে, যাদের বলে পোষক কোষ, প্রবেশ করার পর এরা সেই কোষের জিনিসপত্র ব্যবহার করে নিজেরা সংখ্যায় বাড়তে থাকে আর সেই কোষ মারা যাবার পর অন্য কোষে ছড়িয়ে পড়ে। এ তো ছোটবেলার পড়া জিনিষ।‘
‘বেশ, আর করোনা ভাইরাসের সম্পর্কে কি জানা গেছে?’
‘করোনা ভাইরাস এক রকমের আরএনএ ভাইরাস, এদের বাইরে থাকে লিপিডের আবরণ। যেটা এদের বৈশিষ্ট্য সেটা হল এই আবরণের গায়ে কাঁটার মতো কিছু জিনিষ থাকে যেটার সাহায্যে এরা পোষক কোষে লেগে যেতে পারে। আগের বার যে SARS হয়েছিল, সেটাও এরকম একটা করোনা ভাইরাস।‘
কানাইদা খুশি হয়েছে বলে মনে হল, বলল, ‘যেটা বললি না, সেটা হল এই কাঁটার মতো জিনিসগুলো মানুষের রক্তে থাকা একটা নির্দিষ্ট এনজাইমের সাথে লাগতে পারে, যার নাম Angiotensin-Converting Enzyme 2। আর এই বৈশিষ্টের জন্য SARS করোনা ভাইরাস পশুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে আসতে পেরেছিল। এই নতুন করোনা ভাইরাস, যাকে বলা হচ্ছে SARS-CoV-2, তাদেরও এই বৈশিষ্ট্যটা আছে, বরং SARS এর থেকে বেশী মাত্রায় আছে। শুধু তাই নয়, যে জিনিসগুলো না থাকলে এই কাঁটার মতো জিনিসগুলো কাজ করবে না বা অ্যাকটিভেট হবে না, মানুষের শরীরে সেই কেমিক্যালগুলোও প্রচুর পরিমাণে আছে। এর আরও একটা গুণ আছে – এই কাঁটা গুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে এর দুটো অংশ – একটা দিয়ে কোষের গায়ে লাগে আর অন্যটা দিয়ে এই কোষগুলো কে ফাঁক করে ভেতরে ঢোকে।‘
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হ্যাঁ সে তো বুঝলাম। কিন্তু এই জিনিস তো ল্যাবেও বানানো যায়।‘
কানাইদা হেসে বলল, ‘ধীরে বন্ধু ধীরে। তুই জানিস নিশ্চয়, যে কোন কাজে পুরো মাত্রায় হাত দেবার আগে একটা প্রাথমিক পরীক্ষা করা হয়, যে কাজ টা করা লাভ জনক কিনা। ধর, তুই একটা প্রোডাক্ট বাজারে লঞ্চ করবি, তার আগে মার্কেটে পরীক্ষা করা হয়, যে পাবলিক এটার ব্যাপারে উৎসাহী কিনা। সে রকম নতুন কোন গাড়ির মডেল আসার আগে দেখা হয়, বিক্রি কেমন হতে পারে। এসবই করা হয় পুরনো রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে, অঙ্ক কষে বের করা যায় এই সব হিসেব। এখন এই সব কাজ কম্পিউটারে হয়, যাকে বলে কম্পিউটার মডেল। ঠিক তো?’
আমি সন্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘তাতে কি প্রমাণ হয়?’
কানাইদা বলে চলল, ‘SARS আক্রমণ হবার পর থেকে বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু কম্পিউটার মডেল বানাতে শুরু করেছিলেন এটা দেখার জন্য যে মানুষের শরীরের কোন কেমিক্যালের সাথে করোনা ভাইরাস লাগতে পারে, আর লাগলেও, সেই বন্ধন কতটা মজবুত। এই নতুন করোনা ভাইরাস কে যখন সেই মডেলে পরীক্ষা করা হল, তখন দেখা গেলো যে ভাইরাসটা আগে যে এনজাইমের কথা বললাম, তার সাথে লাগছে ঠিকই, কিন্তু সেই বন্ধন ফেভিকলের মতো মজবুত নয়, এমনকি যে শক্তিতে SARS লাগতে পারত, তার থেকেও দুর্বল। যদি তাই হয়, তাহলে একটা কথা বল, যদি আমি এই ভাইরাসটা বানাবো বলে ঠিক করি, তাহলে আমি প্রথম তো এই মডেলে পরীক্ষা করে দেখবো যে এটা ঠিক ঠাক কাজ করছে কিনা। আমার মডেল যদি প্রথমেই আমাকে বলে, এই ভাইরাস দুর্বল বা ঠিক ঠাক কাজ করবে না, তাহলে আমি আর কি সেই কাজে অগ্রসর হব?’
ঢোঁক গিলে মানতেই হল, ‘না, হব না।‘
‘আমি-তুই না হলে কি হবে, নেচার হয়েছে। সে এমন ভাবে এই ভাইরাসের আকৃতি পাল্টে দিয়েছে, ওই যেটাকে আমরা বলি মিউটেশন, যে এই ভাইরাস ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছে। আর এই পুরো কাজটাই হয়েছে বাদুড় বা ওই জাতীয় কোন প্রাণীর দেহে। কি করে বোঝা গেলো, জানিস?’
বোকার মতো চুপ করে আছি দেখে, কানাইদা বলল, ‘মানুষের শরীরের করোনার সাথে আজ পর্যন্ত জানা বা পরীক্ষা হওয়া করোনা গুলোর আকৃতি ততটা মেলে না যতটা মেলে বাদুড় জাতীয় প্রাণীর দেহের করোনার সাথে। কিন্তু সেই ভাইরাস গুলো আজ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়নি সে ভাবে আর হলেও দেখা গেছে তারা মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারে না। তাই তুই যদি ভাইরাসটা বানাতে চাইতিস, নিশ্চয়ই এমন কোন ভাইরাস থেকে বানাতি যেটা মানুষের পক্ষে ক্ষতিকারক। তাই নয় কি?’
বিজ্ঞানীর যুক্তির সামনে স্বীকার করতেই হল, সেটাই করা স্বাভাবিক। তাও এতটা জ্ঞান একবারে শুনে মাথাটা কেমন করছিল, তাই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তাহলে মালটা এলো কি ভাবে?’
কানাইদা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘সেটাই তো আসল প্রশ্ন। দ্যাখ, আজ পর্যন্ত দুটো সম্ভাবনার কথা শোনা গেছে। একটা হল, সরাসরি বাদুড় জাতীয় প্রাণীর দেহ থেকে আমাদের শরীরে এসেছে, যেমন হয়েছিল বেজী জাতীয় প্রাণীর থেকে SARS বা উটের থেকে MERS। এদের ভক্ষণ করার ফলে, সেটা বুঝতেই পারছিস। যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে মানুষের শরীরে ঢোকার আগেই এই ভাইরাসের ক্ষতি করার ক্ষমতা অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল ওই সব প্রাণীদের দেহে থাকাকালীনই। আর একটা মত হচ্ছে, মানুষের শরীরে ঢোকার পর এদের ক্ষতি করার ক্ষমতা জন্মায়। ওই কাঁটার মতো জিনিসগুলো যেগুলো দিয়ে ওরা মানুষের কোষে লাগছিল, সেগুলো আরও শক্তিশালী হয়, আগে যে বলেছিলাম ফাঁক করে ঢোকার ক্ষমতা, সেটা এই সময় আসে। এই জিনিস কিন্তু বাদুড় এর করোনার নেই, মানুষ ছাড়া এই জিনিস পাওয়া গেছে প্যাঙ্গলিন নামক প্রাণীর দেহে। তাই এটা মনে করা হচ্ছে, প্রথমে বাদুড়, সেখান থেকে প্যাঙ্গলিন হয়ে করোনা মানুষের শরীরে ঢুকেছে। আর প্যাঙ্গলিন এর ওপর কাজ কিন্তু মানুষে ধরা পরার পর তারপর শুরু হয়েছে। তাই বুঝতেই পারছিস, এটা পুরোপুরি প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে, মানুষ চাইলেও এই জিনিস করতে পারত না।‘
‘এত কথা জানলে কোথা থেকে, কানাইদা?’ অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
‘আরে, কদিন আগে এই কাজের ফলাফল গুলো প্রকাশ পেয়েছে নেচার পত্রিকায়। মনে রাখিস, বিজ্ঞানীদের মধ্যে কিন্তু চীন দেশীয় লোক একজনও নেই, সবাই আমেরিকার।‘
‘তাহলে, আমেরিকার লোকজন যে উল্টো কথা বলছে?’
‘তারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষার বা বিজ্ঞানের সাথে এদের অনেকেরই কোন যোগাযোগ নেই রে। তবে শুধু আমেরিকা বলে না, সব দেশেই কিছু লোক এমন থাকে, মিডিয়া থাকে, লোক জনকে যারা সত্যি কথাটা জানায় না। আর আমরাও ভাবি, সত্যি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বলছেন যখন, তখন উনি কি আর বাজে কথা বলবেন? জেনেই বলছেন নিশ্চয়। আমরাও মেতে উঠি, তাই বিজ্ঞান হাজার বার অন্য কথা বললেও, সেগুলো বিশ্বাস হয় না। আসলে কি জানিস তো, মানুষ নিজের অক্ষমতার একটা দোহাই সব সময় তৈরি করে রাখে। এই সময় সেগুলো আরও ভালো করে বোঝা যায়।‘
আমি তবুও হাল ছাড়তে নারাজ, ‘বেশ মেনে নিলাম…’ কানাইদা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘একটু ওয়েট কর। বকে বকে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চল, কোথাও একটু বসে গলা ভেজাই।‘
